নিজস্ব প্রতিবেদক:
সরকার আসে সরকার যায় কিন্তু তিনি সর্বদা থেকে যান সুবিধাজনক অবস্থানে। শত অপরাধ করলেও অদৃশ্য কারিশমায় তা ঢাকা পড়ে যায়। আন্দোলন প্রতিবাদে অন্যের চেয়ার নড়লেও তার চেয়ার নড়েনা। এজন্যে সংশ্লিষ্ট মহলে তিনি গণপূর্তের মুকুটবিহীন সম্রাট আখ্যা পেয়েছেন। আর এই মুকুটবিহীন সম্রাট হচ্ছেন নগর গণপূর্ত বিভাগ ঢাকা-৪ এর নির্বাহী প্রকৌশলী মো: মাসুদ রানা।
স্বৈরাচার শেখ হাসিনার আমলে সাবেক প্রতিমন্ত্রী শরীফ হোসেন ডিলুর মাধ্যমে ২০১৯ সালে রাজশাহী থেকে ঢাকায় বদলী হয়ে আসেন। বনে যান প্রতিমন্ত্রীর একান্ত লোক। তাকে সব রকম সুযোগ সুবিধা দিয়ে গণপূর্তের অঘোষিত ‘রাজা’ বনে যান। এরপরই তার ডিভিশনে অতিরিক্ত বাজেট বরাদ্দ হতে থাকে। আর কাগজ কলমে প্রকল্প বাস্তবায়ন দেখিয়ে লুটে নেন কোটি কোটি টাকা।
সুত্রমতে, সাবেক মন্ত্রী আওয়ামী দোসর শরীফ হোসেন ডিলুর ইচ্ছায় রাজশাহী থেকে তাকে বদলী করে ঢাকায় আনা হয়। এরপর পদায়ন করা হয় ঢাকা শেরে বাংলা নগর -৩ নং ডিভিশনে । সেখান থেকে লুটপাট করার পর সাবেক মন্ত্রী র, আ, ম উবায়দুর মুক্তাদুরের আমলে বিশেষ তদবীরে ঢাকা -৪ ডিভিশনে পদায়ন পান। এই দুটি গুরুত্বপূর্ণ ডিভিশনেই তিনি প্রায় ৪ বছর চাকুরী করেছেন। এসব ডিভিশনে নির্বাহী প্রকৌশলীর দায়িত্বে থেকে অবৈধ পথে আয় করেছেন কাড়ি কাড়ি টাকা। আর সে সব টাকায় হাতের মুঠিতে ধরে রেখেছেন গণপূর্ত মন্ত্রণালয়ের মন্ত্রী, প্রতিমন্ত্রী ও প্রধান প্রকৌশলীকে। কথিত আছে যে, যখন যে মন্ত্রী যখন ক্ষমতায় আসেন তখনই সেই মন্ত্রী,প্রতিমন্ত্রীর একান্ত লোক বনে যান প্রকৌশলী মো: মাসুদ রানা।
এ ছাড়াও তিনি সাবেক প্রধান প্রকৌশলী মো: শামীম আখতারকে নিজের আত্মীয় বলে পরিচয় দেন। যে কারণে ঢাকার বাইরে তার বদলী হয় না। ঘুরে ফিরে ঢাকা ডিভিশনের মধ্যেই আছেন গত প্রায় ৭ বছর। অথচ: ৫ আগষ্ট স্বৈরাচার শেখ হাসিনার পতন হলে সরকারী সমস্ত দপ্তরে ব্যাপক রদবদল করে আওয়ামী সুবিধাবাদী কর্মকর্তাদের সরিয়ে দেওয়া হয়। বিগত অন্তর্বর্তীকালীন সরকার আমলে তিনি গণপূর্ত মন্ত্রণালয়ের উপদেষ্টা মো: আদিলুর রহমানকে ম্যানেজ করে ঢাকার গুরুত্বপূর্ণ নগর গণপূর্তের ৪ নং ডিভিশনে রয়ে যান।
অভিযোগ আছে যে, তিনি রাজশাহী ডিভিশনের লোক হওয়ায় স্বৈরাচার শেখ হাসিনার দোসর বর্তমান রাষ্ট্রপতি মো: শাহাবুদ্দীন চুপ্পুর সাথেও বিশেষ সম্পর্ক গড়ে তোলেন। তার বাসায় ঘনঘন যাতায়াত করেন। তার ক্ষমতার প্রভাবও বিস্তার করেছেন গণপূর্তে।
অন্তরবর্তীকালীন সরকার বিদায় নিয়ে জাতীয় নির্বাচনে একক সংখ্যাগরিষ্ঠতা পেয়ে বিএনপি সরকার গঠন করলেও নির্বাহী প্রকৌশলী মাসুদ রানার কোন পরিবর্তন হয়নি। তিনি এখনো নগর গণপূর্তের ৪ নং ডিভিশনেই বহাল তবিয়তে রয়েছেন। এ ক্ষেত্রে তিনি বর্তমান সরকারের গণপূর্ত মন্ত্রী ও প্রতিমন্ত্রীর নাম ব্যবহার করছেন। বলছেন, দুইজন মন্ত্রী,প্রতিমন্ত্রীই নাকি তার আত্মীয়। এতে করে তাদের ভাবমুর্তি ক্ষুন্ন হচ্ছে। বিএনপি সরকারেরও বদনাম হচ্ছে। কথিত আছে যে বর্তমান প্রধান প্রকৌশলীকে তিনি ৩ কোটি টাকা দিয়ে স্বপদ ধরে রেখেছেন।
আরো জানাগেছে, ঢাকার অভিজাত এলাকার ফাইভ স্টার হোটেলে সুন্দরী নারীদের নিয়েও রঙ্গলীলা করার অভিযোগও আছে তার বিরুদ্ধে। জুলাইয় ছাত্র আন্দোলনে ছাত্র জনতার বিরুদ্ধে থাকা এই নির্বাহী প্রকৌশলী গণপূর্তের ঠিকাদার মহলে মিস্টার ১৫% রানা হিসেবে ব্যাপক পরিচিত। অভিযোগ রয়েছে, ঢাকা শেরেবাংলা নগর গণপূর্ত বিভাগ-৩ এ থাকা অবস্থায় তিনি হাজার কোটি টাকার প্রকল্পের টেন্ডারে অতিরিক্ত ব্যয়ের প্রাক্কলন, টেন্ডারের তথ্য ফাঁস, দর-কষাকষির নামে অনৈতিক সুবিধা নিয়ে ঠিকাদার নিয়োগ দিয়ে শত কোটি টাকার অবৈধ সম্পদের মালিক হয়েছেন।
বর্তমানে ঢাকা নগর গণপূর্ত বিভাগ -৪ এর নির্বাহী প্রকৌশলী হিসেবে একই লুটপাটের ধারা বজায় রেখেছেন। তার বিরুদ্ধে একটি স্পর্শকাতর অভিযোগ হলো-তিনি ২০২৪ সালের জুলাই মাসে মিরপুরে বৈষম্য বিরোধী ছাত্র আন্দোলন দমানোর জন্য আওয়ামী লীগের বিভিন্ন অঙ্গ ও সহযোগী সংগঠনের নেতা-কর্মীদের আর্থিকভাবে সহায়তা করেছেন। এবং আওয়ামী যুবলীগের কেন্দ্রিয় নেতা সাবেক এমপি মাঈনুল হোসেন খান নিখিলের কথামত সব কাজ করতেন। এ নিয়ে শেরে বাংলা নগর থানার সামনে তার বিরুদ্ধে বিক্ষোভ মিছিল বের করেছিলো সাধারণ শিক্ষার্থীরা। এ বিষয়ে কথা বলার জন্য তার মোবাইল ফোনে বারবার কল দেওয়া হলেও তিনি কল রিসিভ করেন নি।
নির্ভরযোগ্য সূত্রে জানা গেছে, মাসুদ রানার দুর্নীতির কৌশল ছিল বহুমুখী। টেন্ডার চূড়ান্ত হওয়ার আগেই ঠিকাদারদের কাছ থেকে অগ্রিম কমিশন নেওয়া, কাজ সম্পন্ন না করেই ভুয়া ভাউচারের মাধ্যমে বিল উত্তোলন এবং অস্তিত্বহীন প্রকল্পের নামে অর্থ আত্মসাতের গুরুতর অভিযোগ উঠেছে তার বিরুদ্ধে। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একাধিক ঠিকাদার জানান, তার নির্ধারিত কমিশন ছাড়া কোনো বিল পাশ করা প্রায় অসম্ভব ছিল।
সূত্রমতে, শেরেবাংলা নগর গণপূর্ত বিভাগ-৩-এ কর্মরত থাকাকালে তৎকালীন প্রভাবশালী সচিব শহীদুল্লাহ খন্দকারের সান্নিধ্যে আসার পর থেকেই মাসুদ রানার ক্ষমতার বলয় তৈরি হয়। এরপর তিনি অধিদপ্তরের ভেতরে একচ্ছত্র আধিপত্য বিস্তার করেন। এমনকি সাবেক প্রধান প্রকৌশলী আশরাফুল আলমের ঘনিষ্ঠ হিসেবে তার ‘ক্যাশিয়ার’ বা অর্থ সংগ্রাহক হিসেবেও তিনি পরিচিতি পান।
বিস্ময়কর বিষয় হলো, দুর্নীতির দায়ে তাকে কয়েকবার বদলি করা হলেও অদৃশ্য শক্তিবলে তিনি গুরুত্বপূর্ণ পদ বাগিয়ে নিয়েছেন। অনেকের মতে, এই প্রকৌশলীর প্রভাবের কাছে সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ও যেন অসহায়।
সম্পদের পাহাড়:
দুর্নীতির মাধ্যমে মাসুদ রানা গড়ে তুলেছেন শতকোটি টাকার সম্পদ। তার স্থাবর-অস্থাবর সম্পদের যে তালিকা পাওয়া গেছে তা পিলে চমকানোর মতো: গুলশানে ঘনিষ্ঠ এক ঠিকাদারের মাধ্যমে প্রাপ্ত একটি বিলাসবহুল ফ্ল্যাট। রামপুরা বনশ্রীর ডি-ব্লকে (বাসা নং ৫৪/ডি) ৫ তলা বিশিষ্ট একটি বাড়ি, যার বর্তমান বাজারমূল্য প্রায় ৮ কোটি টাকা। এছাড়া এফ-ব্লকের মোল্লা ম্যানশনে স্ত্রীর নামে আরও দুটি ফ্ল্যাট রয়েছে। বসুন্ধরা সিটিতে বসুন্ধরা সিটি শপিং কমপ্লেক্সের পঞ্চম তলায় (বি ব্লক) দুটি মূল্যবান দোকান। মোহাম্মদপুরে বাবর রোডে (রোড-৯, বাসা-১৮৯/এ) নিজের নামে ১০ কাঠার একটি বিশাল প্লট, যার আনুমানিক মূল্য ১০ কোটি টাকার বেশি। এছাড়া মোহাম্মদপুর ও রাজধানীর বিভিন্ন এলাকায় নিজের এবং শ্বশুরবাড়ির আত্মীয়-স্বজনের নামে একাধিক ফ্ল্যাট ও জমি থাকার তথ্য উঠে এসেছে।
জনগণের প্রশ্ন: আওয়ামী লীগ সরকারের সুবিধাভোগী এই কর্মকর্তার বিরুদ্ধে এখনো কেন শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি, তা নিয়ে অধিদপ্তরে চাপা ক্ষোভ বিরাজ করছে। বিএনপি সরকারের এই সময়ে এসেও যদি এসব ‘ফ্যাসিবাদী ব্যবস্থার উত্তরাধিকারী’রা বহাল তবিয়তে থাকেন, তবে বর্তমান সরকারের দুর্নীতির বিরুদ্ধে ‘জিরো টলারেন্স’ নীতি প্রশ্নবিদ্ধ হতে পারে। সংশ্লিষ্ট সচেতন মহলের দাবি, এই প্রকৌশলীর অবৈধ সম্পদের নিরপেক্ষ ও দৃশ্যমান তদন্ত করা হোক। একই সাথে তাকে যে কোন জেলায় বদলী করা হোক।
সম্পাদক ও প্রকাশক : ইসমাইল হোসেন সৌরভ,
নির্বাহী সম্পাদক:মো:শাহাবুদ্দিন খান
বার্তা প্রধান : মোহাম্মদ শাহ্ কামাল,
কপিরাইট © সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত