বিশেষ প্রতিনিধি:
বাংলা চলচ্চিত্রের ইতিহাসে সবচেয়ে জনপ্রিয় ও আলোচিত নায়কদের একজন সালমান শাহ। অল্প কয়েক বছরের ক্যারিয়ারে আকাশচুম্বী জনপ্রিয়তা অর্জন করা এই নায়ক ১৯৯৬ সালের ৬ সেপ্টেম্বর মাত্র ২৪ বছর বয়সে মারা যান। রাজধানীর ইস্কাটনের বাসা থেকে তার মরদেহ উদ্ধারের পর ঘটনাটি প্রথমে অপমৃত্যু হিসেবে নথিভুক্ত হয়। পরবর্তী সময়ে একাধিক তদন্তে এই মৃত্যুকে আত্মহত্যা হিসেবে উল্লেখ করা হলেও সালমান শাহর পরিবার সেই সিদ্ধান্ত মেনে নেয়নি। দীর্ঘ ২৯ বছর পর ২০২৫ সালে আদালতের নির্দেশে ঘটনাটি হত্যা মামলা হিসেবে নতুন করে তদন্তের পথ খুলে যায়।
সালমান শাহর মৃত্যুর পর থেকেই তার স্ত্রী সামিরা হককে ঘিরে নানা অভিযোগ ও বিতর্ক তৈরি হয়। দাম্পত্য জীবনের টানাপোড়েন এবং অন্য ব্যক্তির সঙ্গে কথিত সম্পর্কের নানা গুঞ্জনও সময়ের সঙ্গে আলোচনায় আসে। তবে এসব অভিযোগের সবকটিকে প্রমাণিত সত্য হিসেবে উপস্থাপনের সুযোগ নেই।
সামিরা হক বিভিন্ন সময়ে এসব অভিযোগ অস্বীকার করেছেন এবং সালমান শাহর মৃত্যুকে আত্মহত্যা বলে দাবি করেছেন। ফলে একদিকে পরিবারের হত্যার অভিযোগ, অন্যদিকে আত্মহত্যার পক্ষে দেওয়া বক্তব্য- দুই বিপরীত অবস্থানই দীর্ঘদিন ধরে রহস্যকে আরও জটিল করেছে।
সালমান শাহর ঘনিষ্ঠ বন্ধু ও চলচ্চিত্র অভিনেতা আশরাফুল হক ওরফে ডন, এর নামও বহু বছর ধরে এ ঘটনাকে ঘিরে আলোচনায় রয়েছে। বিভিন্ন সময় বিভিন্ন ব্যক্তি ও গণমাধ্যমে তাকে নিয়ে নানা অভিযোগ ও দাবি সামনে এসেছে। তবে এসব বক্তব্যের অনেকটাই অভিযোগ, দাবি বা পুরোনো জবানবন্দিনির্ভর, সেগুলোকে আদালতে প্রমাণিত সত্য হিসেবে ধরে নেওয়া যায় না।
নতুন করে মামলা হওয়ার পর ডনও আলোচনার কেন্দ্রে চলে আসেন। ২০২৫ সালের ২১ অক্টোবর সালমান শাহর মামা মোহাম্মদ আলমগীর ১১ জনকে আসামি করে রমনা থানায় হত্যা মামলা করেন। মামলায় সামিরা হক, লতিফা হক লুসি, ব্যবসায়ী আজিজ মোহাম্মদ ভাই, অভিনেতা আশরাফুল হক ডনসহ আরও কয়েকজনের নাম রয়েছে।
ডনের গ্রেফতার নিয়ে বিভ্রান্তি
মামলা দায়েরের পর বিভিন্ন সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ও অনলাইন প্ল্যাটফর্মে ‘ডন গ্রেফতার’ শিরোনামে একাধিক ভিডিও ও দাবি ছড়িয়ে পড়ে। এমনকি গ্রেফতার ও রিমান্ড নিয়ে নানা চাঞ্চল্যকর তথ্যও প্রচার করা হয়। কিন্তু নির্ভরযোগ্য সংবাদসূত্রে ডনের সাম্প্রতিক গ্রেফতার নিশ্চিত হওয়ার তথ্য পাওয়া যায়নি।
বরং ২০২৫ সালের ২৭ অক্টোবর ঢাকা মহানগর আদালত সালমান শাহ হত্যা মামলায় সামিরা হক ও আশরাফুল হক ডনের দেশত্যাগে নিষেধাজ্ঞা জারি করেছিলেন। পরবর্তী প্রতিবেদনগুলোতেও ডনকে মামলার আসামি হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে।
অতএব, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রচারিত গ্রেফতারের দাবিকে আদালত বা আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর আনুষ্ঠানিক তথ্য দিয়ে নিশ্চিত না হওয়া পর্যন্ত ‘গ্রেফতার’ হিসেবে প্রকাশ করা সাংবাদিকতার দৃষ্টিতে সমীচীন নয়।
১১ আসামির বিরুদ্ধে হত্যা মামলা, তদন্ত চলছে
২০২৫ সালের ২০ অক্টোবর ঢাকার ষষ্ঠ অতিরিক্ত মহানগর দায়রা জজ আদালত সালমান শাহর মৃত্যুর পুরোনো ঘটনাকে হত্যা মামলা হিসেবে তদন্তের নির্দেশ দেন। এর পরদিন তার মামা মোহাম্মদ আলমগীর রমনা থানায় দণ্ডবিধির ৩০২ ও ৩৪ ধারায় মামলা করেন। মামলায় মোট ১১ জনকে আসামি করা হয়।
মামলার তদন্তে একাধিকবার সময় বাড়ানো হয়েছে। সর্বশেষ ২৩ জুলাই ২০২৬ আদালত তদন্ত প্রতিবেদন দাখিলের জন্য ৩০ আগস্ট ২০২৬ তারিখ নির্ধারণ করেছেন।
সালমান শাহর মৃত্যুর প্রকৃত কারণ নতুন করে অনুসন্ধানের বিষয়টি সামনে আসায় তার মরদেহ উত্তোলন ও পুনরায় ফরেনসিক পরীক্ষার উদ্যোগ নিয়েও আলোচনা হয়েছে। পরিবারের পক্ষ থেকে দীর্ঘদিনের প্রশ্নের নিরপেক্ষ ও বৈজ্ঞানিক উত্তর পাওয়ার প্রত্যাশা রয়েছে।
তবে তদন্ত শেষ হওয়ার আগে কোনো ব্যক্তি বা পক্ষকে হত্যার জন্য দায়ী হিসেবে চূড়ান্তভাবে চিহ্নিত করা আইনগতভাবে সঠিক নয়। আদালতের তদন্ত, ফরেনসিক তথ্য, সাক্ষ্য-প্রমাণ এবং পরবর্তী বিচারিক সিদ্ধান্তই নির্ধারণ করবে ১৯৯৬ সালের সেই ঘটনায় প্রকৃতপক্ষে কী ঘটেছিল।
সালমান শাহর মৃত্যুর প্রায় তিন দশক পেরিয়ে গেলেও রহস্যের পুরোপুরি সমাধান হয়নি। একাধিক তদন্তে আত্মহত্যার কথা উঠে এলেও পরিবার ও ভক্তদের একাংশ তা প্রত্যাখ্যান করে আসছে। নতুন হত্যা মামলা সেই পুরোনো প্রশ্নকে আবারও সামনে এনেছে।
সালমানের সঙ্গে কার সম্পর্ক কেমন ছিল, দাম্পত্য জীবনে কোনো বিরোধ ছিল কি না, মৃত্যুর পেছনে অন্য কারও ভূমিকা ছিল কি না, এসব প্রশ্নের উত্তর এখন আর গুঞ্জন বা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের ভিডিওতে খোঁজার সুযোগ নেই।
প্রয়োজন নিরপেক্ষ তদন্ত ও আদালতে গ্রহণযোগ্য প্রমাণ।
সালমান শাহ নেই প্রায় তিন দশক। কিন্তু তার মৃত্যু নিয়ে মানুষের কৌতূহল আজও অটুট। নতুন হত্যা মামলা, চলমান তদন্ত এবং আগামী ৩০ আগস্ট তদন্ত প্রতিবেদন দাখিলের নির্ধারিত তারিখ,সব মিলিয়ে দীর্ঘদিনের এই রহস্যের সমাপ্তি কোথায় গিয়ে দাঁড়ায়, এখন সেটিই দেখার বিষয়।
সম্পাদক ও প্রকাশক : ইসমাইল হোসেন সৌরভ,
নির্বাহী সম্পাদক:মো:শাহাবুদ্দিন খান
বার্তা প্রধান : মোহাম্মদ শাহ্ কামাল,
কপিরাইট © সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত