নীলফামারী প্রতিনিধি:
নীলফামারীর জলঢাকা পৌর এলাকার মুদি পাড়ায় প্রায় ১০০ বছরের পুরোনো একটি কালী মন্দিরের প্রবেশগেট ও পূর্বদেয়াল ভেঙে ফেলার অভিযোগ উঠেছে। মন্দিরের সামনের রাস্তা সম্প্রসারণ ও পাকাকরণের কাজকে কেন্দ্র করে এ ভাঙচুরের ঘটনা ঘটেছে বলে অভিযোগ করেছেন মন্দিরসংশ্লিষ্টরা। এ ঘটনায় এলাকায় ক্ষোভ ও উদ্বেগের সৃষ্টি হয়েছে।
অভিযোগকারী প্রশান্ত কর্মকারের দাবি, শতবর্ষী এই মন্দিরের সামনে রাস্তার প্রস্থ নিয়ে জটিলতা তৈরি হয়। পৌরসভার অভ্যন্তরে থাকা কাঁচা রাস্তাটি পাকা করার জন্য টেন্ডার হওয়ার পর বর্তমানে সেখানে উন্নয়নকাজ চলছে। রাস্তার নির্ধারিত প্রস্থ দুই মিটার কম থাকায় মন্দিরের সামনের অংশ নিয়ে সমস্যা তৈরি হয়। এরই ধারাবাহিকতায় মন্দিরের প্রবেশগেট ও পূর্বদেয়াল ভেঙে ফেলা হয়েছে বলে অভিযোগ তাঁর।
তবে ভাঙচুরের সঙ্গে কারা জড়িত এবং ঠিক কী পরিস্থিতিতে মন্দিরের স্থাপনা ভাঙা হয়েছে, সে বিষয়ে তদন্তের মাধ্যমে প্রকৃত ঘটনা বেরিয়ে আসা জরুরি বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
সরেজমিনে মন্দিরের গেট ও দেয়াল ভাঙা অবস্থায়
ঘটনার পর সরেজমিনে গিয়ে মন্দিরের পূর্বদিকের দেয়াল এবং প্রবেশপথের গেট ভাঙা অবস্থায় দেখা যায়। স্থানীয়দের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, মন্দিরটি দীর্ঘদিন ধরে ওই এলাকার হিন্দু সম্প্রদায়ের ধর্মীয় আচার-অনুষ্ঠানের একটি গুরুত্বপূর্ণ স্থান হিসেবে ব্যবহৃত হয়ে আসছে। পুরোনো এই মন্দিরকে ঘিরে স্থানীয় বাসিন্দাদের মধ্যে দীর্ঘদিনের ধর্মীয় ও সামাজিক সম্পৃক্ততা রয়েছে।
মন্দিরের সামনের রাস্তা বর্তমানে উন্নয়নকাজের আওতায় রয়েছে। রাস্তা পাকা করার উদ্যোগকে কেন্দ্র করেই মন্দিরের সীমানা ও রাস্তার জায়গা নিয়ে প্রশ্ন তৈরি হয়েছে বলে সংশ্লিষ্টদের বক্তব্যে উঠে এসেছে।
অভিযোগকারী প্রশান্ত কর্মকার বলেন, তাঁদের পূর্বপুরুষদের সময় থেকে মন্দিরটি ওই স্থানে রয়েছে। তাঁর ভাষ্য অনুযায়ী, প্রায় এক শতাব্দী ধরে মন্দিরটি এলাকাবাসীর ধর্মীয় বিশ্বাস ও ঐতিহ্যের সঙ্গে জড়িত। এমন একটি পুরোনো ধর্মীয় স্থাপনার অংশ ভেঙে দেওয়ায় তাঁরা ক্ষুব্ধ ও মর্মাহত।
তিনি বলেন, রাস্তা পাকা করার বিষয়টি নিয়ে যদি কোনো সমস্যা থেকেও থাকে, তাহলে সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে আলোচনা করে সমাধান করা যেত। কিন্তু মন্দিরের গেট ও দেয়াল ভেঙে দেওয়ার ঘটনাকে তাঁরা কোনোভাবেই মেনে নিতে পারছেন না।
রাস্তা পাকা করার কাজ চলমান
জলঢাকা পৌরসভার ভেতরে থাকা মন্দিরসংলগ্ন কাঁচা রাস্তাটি পাকা করার জন্য ইতোমধ্যে টেন্ডার প্রক্রিয়া সম্পন্ন হয়েছে। বর্তমানে ওই রাস্তার পাকাকরণের কাজ চলমান রয়েছে। উন্নয়নকাজের অংশ হিসেবে রাস্তার নির্ধারিত প্রস্থ ও সীমানা নিয়ে মন্দিরের সামনের অংশে জটিলতা দেখা দেয়।
অভিযোগকারীর দাবি, মন্দিরের সামনের রাস্তার প্রস্থ প্রয়োজনের তুলনায় প্রায় দুই মিটার কম থাকায় রাস্তার কাজ বাস্তবায়নের জন্য মন্দিরের গেট ও পূর্বদেয়াল ভেঙে ফেলা হয়েছে। তাঁর অভিযোগ, এ কাজ করার সময় মন্দির কর্তৃপক্ষ বা সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে যথাযথভাবে আলোচনা করা হয়নি।
তবে রাস্তা নির্মাণের নকশা, সরকারি সীমানা, মন্দিরের জমির প্রকৃত পরিমাণ এবং ভাঙচুরের বৈধতা—এসব বিষয় প্রশাসনিক তদন্তে পরিষ্কার হওয়া দরকার। রাস্তা নির্মাণের জন্য কোনো স্থাপনা অপসারণের ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের অনুমোদন ছিল কি না, সেটিও তদন্তের গুরুত্বপূর্ণ অংশ বলে মনে করছেন এলাকাবাসী।
ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেন এমপি, ইউএনও ও ওসি
ঘটনার খবর পেয়ে ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেছেন জলঢাকার সংসদ সদস্য ওবায়দুল্লাহ সালাফী, উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) এবং জলঢাকা থানার অফিসার ইনচার্জ (ওসি)। তাঁরা মন্দির এলাকা ঘুরে দেখেন এবং স্থানীয়দের সঙ্গে কথা বলেন।
ঘটনাস্থল পরিদর্শনকালে সংশ্লিষ্টদের কাছ থেকে ঘটনার বিস্তারিত জানার চেষ্টা করা হয়। মন্দিরের ভাঙা গেট ও দেয়াল এবং রাস্তা নির্মাণের চলমান কাজও তাঁরা দেখেন বলে জানা গেছে।
জলঢাকার সংসদ সদস্য ওবায়দুল্লাহ সালাফী বলেন, মন্দির ভাঙচুরের ঘটনায় যারা জড়িত, তদন্তে তাদের পরিচয় পাওয়া গেলে তাদের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়া হবে। তিনি ঘটনাটিকে গুরুত্বের সঙ্গে দেখার আশ্বাস দেন।
এমপির এমন বক্তব্যে স্থানীয় হিন্দু সম্প্রদায়ের মধ্যে কিছুটা স্বস্তি ফিরে এসেছে বলে জানা গেছে। এলাকাবাসীর প্রত্যাশা, নিরপেক্ষ তদন্তের মাধ্যমে ঘটনার প্রকৃত কারণ ও দায়ীদের চিহ্নিত করা হবে এবং ভবিষ্যতে এ ধরনের ঘটনা যাতে আর না ঘটে, সে জন্য প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
থানায় লিখিত অভিযোগ
এ ঘটনায় প্রশান্ত কর্মকার বাদী হয়ে জলঢাকা থানায় একটি লিখিত অভিযোগ করেছেন বলে জানা গেছে। অভিযোগে মন্দিরের গেট ও পূর্বদেয়াল ভেঙে দেওয়ার বিষয়টি উল্লেখ করা হয়েছে।
অভিযোগকারী জানান, তাঁরা চান পুলিশ অভিযোগটি গুরুত্বের সঙ্গে তদন্ত করুক। মন্দিরের মতো একটি ধর্মীয় স্থাপনার ক্ষয়ক্ষতির সঙ্গে জড়িতদের শনাক্ত করে আইনের আওতায় আনা এবং ক্ষতিগ্রস্ত স্থাপনা পুনর্নির্মাণ বা সংস্কারের ব্যবস্থা করা হোক।
তিনি বলেন, ‘‘আমাদের প্রায় ১০০ বছরের পুরোনো মন্দিরের অংশ যারা ভেঙেছে, তাদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি চাই। আমরা চাই, প্রশাসন নিরপেক্ষভাবে বিষয়টি তদন্ত করে প্রকৃত ঘটনা বের করে আনুক।’’
শতবর্ষী মন্দির ঘিরে এলাকাবাসীর উদ্বেগ
স্থানীয় বাসিন্দাদের মতে, মুদি পাড়ার এই কালী মন্দির শুধু একটি ধর্মীয় উপাসনালয় নয়; এটি এলাকার দীর্ঘদিনের ঐতিহ্য ও সামাজিক ইতিহাসেরও অংশ। প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে স্থানীয় হিন্দু সম্প্রদায়ের মানুষ এখানে পূজা-অর্চনা করে আসছেন।
একটি পুরোনো ধর্মীয় স্থাপনার অংশ ভেঙে যাওয়ায় মন্দিরের ঐতিহ্য ও স্থাপত্যগত কাঠামো ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে বলে তাঁরা মনে করছেন। একই সঙ্গে ঘটনাটি নিয়ে যাতে এলাকায় কোনো ধরনের উত্তেজনা বা বিভ্রান্তি সৃষ্টি না হয়, সে বিষয়েও প্রশাসনের দ্রুত পদক্ষেপ কামনা করেছেন তাঁরা।
সম্পাদক ও প্রকাশক : ইসমাইল হোসেন সৌরভ,
নির্বাহী সম্পাদক:মো:শাহাবুদ্দিন খান
বার্তা প্রধান : মোহাম্মদ শাহ্ কামাল,
কপিরাইট © সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত