
বিশেষ প্রতিবেদকঃ
ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন ও গণভোট আয়োজন করতে গিয়ে ব্যয়ের নতুন রেকর্ড গড়তে যাচ্ছে নির্বাচন কমিশন। নির্বাচন পরিচালনা ও আইন-শৃঙ্খলা খাত মিলিয়ে এবার ব্যয় ধরা হয়েছে ৩ হাজার ১০০ কোটি টাকা—যা মাত্র দুই বছর আগের দ্বাদশ সংসদ নির্বাচনের তুলনায় প্রায় এক হাজার কোটি টাকা বেশি।
ভোটের আগেই এ বিপুল ব্যয় নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে—নির্বাচন কি সত্যিই ব্যয়বহুল হয়ে উঠছে, নাকি নিরাপত্তা ও ব্যবস্থাপনার নামে লাগামছাড়া খরচের নতুন দৃষ্টান্ত তৈরি হচ্ছে?
ভোট নয়, নিরাপত্তাই বড় খাত
ইসি সূত্র জানায়, মোট ৩১০০ কোটি টাকার মধ্যে—
আইন-শৃঙ্খলা খাতে বরাদ্দ রাখা হয়েছে ১,৫০০ কোটি টাকা
নির্বাচন পরিচালনায় ব্যয় ধরা হয়েছে ১,২০০ কোটি টাকা
অন্যান্য খাতে (ওসিভি, আইসিপিভি ও গণভোট) ৫০০ কোটি টাকা
অর্থাৎ ভোটের চেয়ে নিরাপত্তা ব্যয়ই এবার বড় হয়ে উঠেছে, যা নির্বাচনের পরিবেশ নিয়েই নতুন করে প্রশ্নের জন্ম দিচ্ছে।
১২ ফেব্রুয়ারি ভোট, ভোটার পৌনে ১৩ কোটি
আগামী ১২ ফেব্রুয়ারি অনুষ্ঠেয় এ নির্বাচনে ভোটার সংখ্যা প্রায় পৌনে ১৩ কোটি। ভোট গ্রহণ হবে প্রায় ৪৩ হাজার কেন্দ্রের মাধ্যমে। ভোট নিতে প্রয়োজন হবে প্রায় আড়াই লাখ ভোটকক্ষ।
প্রতিটি ভোটকক্ষে থাকবে সিল দেওয়ার গোপন কক্ষ (মার্কিং প্লেস)। পাশাপাশি প্রথমবারের মতো চালু হচ্ছে আইটি সাপোর্টেড পোস্টাল ভোটিং, যার পেছনেও মোটা অঙ্কের অর্থ ব্যয় ধরা হয়েছে।
ভোটের মাঠে লাখ লাখ লোকবল
নির্বাচন পরিচালনায় মাঠে নামানো হচ্ছে বিপুল সংখ্যক কর্মকর্তা ও নিরাপত্তা সদস্য—
ভোটগ্রহণ কর্মকর্তা : ৭ লাখ ৮৫ হাজারের বেশি
আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্য : ৯ লাখ ৪৩ হাজার ৫০ জন
সব মিলিয়ে নির্বাচন মানেই এবার প্রায় ১৭ লাখ লোকবলের বিশাল কর্মযজ্ঞ।
অতিরিক্ত এক হাজার কোটি টাকা—চাইলেই মিলছে
চলতি অর্থবছরে নির্বাচনের জন্য বরাদ্দ ছিল ২ হাজার ১০০ কোটি টাকা। তবে তা পর্যাপ্ত নয়—এমন যুক্তিতে জানুয়ারির শুরুতেই অর্থবিভাগে অতিরিক্ত এক হাজার কোটি টাকা চেয়ে প্রস্তাব পাঠায় নির্বাচন কমিশন। অর্থবিভাগ তাতে সায় দিয়েছে।
ইসি সচিব আখতার আহমেদ বলেন, আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর কাছ থেকে চাহিদা আসছে, ধাপে ধাপে অর্থ ছাড় হবে। তবে চূড়ান্ত ব্যয় আরও বাড়তেও পারে বলে ইসি কর্মকর্তাদের বক্তব্য।
৫১ দল, প্রায় ২ হাজার প্রার্থী
এ নির্বাচনে অংশ নিচ্ছে ৫১টি রাজনৈতিক দল।
মোট প্রার্থী ১ হাজার ৯৯৪ জন, এর মধ্যে ২৫৬ জন স্বতন্ত্র।
নির্বাচন পর্যবেক্ষণে থাকবেন—
দেশীয় পর্যবেক্ষক : ৫৫,৪৫৪ জন
বিদেশি পর্যবেক্ষক : প্রায় ৫০০ জন
আগের নির্বাচনগুলোর তুলনায় ব্যয়ের লাফ
দ্বাদশ সংসদ নির্বাচন (২০২৪) : ব্যয় হয়েছিল ১,৯২৭ কোটি টাকা
একাদশ নির্বাচন (২০১৮) : বরাদ্দ ছিল ৭০০ কোটি, পরে বাড়ে
দশম নির্বাচন (২০১৪) : ব্যয় ২৬৪ কোটি টাকা
নবম নির্বাচন (২০০৮) : ব্যয় ১৬৫ কোটি টাকা
প্রথম নির্বাচন (১৯৭৩) : ব্যয় মাত্র ৮১ লাখ টাকা
সময় বদলেছে, প্রযুক্তি এসেছে—কিন্তু প্রশ্ন থেকেই যায়,
ভোটের গণতন্ত্র কি ব্যয়ের প্রতিযোগিতায় পরিণত হচ্ছে?