
সোহাগ হাওলাদার:
অবৈধ বালু উত্তোলন ও বেপরোয়া ভারী যানবাহনের দৌরাত্ম্যে বেড়িবাঁধ সড়ক যেন দিন দিন মৃত্যুর ফাঁদে পরিণত হচ্ছে। প্রতিনিয়ত ঘটছে মর্মান্তিক দুর্ঘটনা, ঝরছে তাজা প্রাণ। সর্বশেষ ভয়াবহ দুর্ঘটনায় কয়েকজন যুবকের প্রাণহানির ঘটনায় এলাকাজুড়ে নেমে এসেছে শোকের ছায়া। স্থানীয়দের অভিযোগ, অবৈধ বালু মহাল থেকে দিন-রাত অতিরিক্ত বালুবাহী ট্রাক চলাচলের কারণে সড়কটি মারাত্মক ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে উঠেছে। রাস্তার বিভিন্ন স্থানে সৃষ্টি হয়েছে বড় বড় গর্ত, ধুলাবালি ও ভাঙন। বিশেষ করে রাতে বেপরোয়া গতিতে চলাচলকারী যানবাহনের কারণে বাড়ছে দুর্ঘটনার ঝুঁকি। সদরঘাট থেকে টঙ্গী ব্রিজ পর্যন্ত ২৫ কিলোমিটার জুড়ে প্রায় তিন শতাধিক ‘ভয়াল বালু সাম্রাজ্য’ গড়ে উঠেছে, চলছে অবৈধ বালু বাণিজ্যের মচ্ছব। সরকারের কোটি কোটি টাকার রাজস্ব ফাঁকি দিয়ে সংঘবদ্ধ চক্র হাজার কোটি টাকার বাণিজ্য ফেঁদে বসেছে। সরকার ঘোষিত বালু মহাল না থাকলেও বেড়িবাঁধ ঘেষা তুরাগ নদীর অর্ধ শতাধিক পয়েন্টকে বালু মহালের মতই ব্যবহার করা হচ্ছে। রাত দিন সেসব স্থান থেকে লাখ লাখ ঘনফুট বালু উত্তোলন করে তা সর্বত্রই সরবরাহ দেওয়া হচ্ছে। বালু বহণকারী শত শত ট্রাকের আনাগোণায় বেহাল থাকছে বেড়িবাঁধ সড়ক। অন্যদিকে বালুর রমরমা বাণিজ্য নিয়ে ব্যবসায়ি গ্রুপগুলোর মধ্যে চলে আধিপত্যের লড়াই। মাঝেমধ্যেই সেখানে ধাওয়া পাল্টা ধাওয়া, বন্দুকবাজি ঘটে বলেও অভিযোগ পাওয়া গেছে।
সংঘবদ্ধ চক্রের অপরিকল্পিত বালু উত্তোলন, যত্রতত্র পাহাড়সম মজুদ গড়ে তোলাসহ বেপরোয়া ব্যবসা বাণিজ্যের ধকলে বেড়িবাঁধ ও আশপাশ এলাকার পরিবেশ প্রতিবেশ মারাত্মক ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে উঠেছে। তুরাগ নদীপাড় ও বাঁধ ঘেষা প্রতিটি মহল্লায় রাত দিন চলে বালুর উড়াউড়ি, চলতে থাকে বালুবাহী অসংখ্য ট্রাকের বিপজ্জনক ছোটাছুটি। ভুক্তভোগিরা জানিয়েছেন, বেশুমার বালুর অবৈধ বাণিজ্যের জেরে গোটা এলাকা যেন ধূলা বালির রাজ্যে পরিনত হয়েছে। ঘরবাড়ি, আসবাবপত্র, পোশাক পরিচ্ছদ এমনকি খাবার সামগ্রি পর্যন্ত আচ্ছন্ন থাকছে ধূলাবালিতে। মিরপুর শাহ আলী (রঃ) এর পবিত্র মাজার শরীফের দর্শনার্থীরাও এ বালু দুর্ভোগ থেকে রেহাই পান না। মিরপুর শিন্নিরটেক, দিয়াবাড়ী, জহুরাবাদ, চিড়িয়াখানা সংলগ্ন মহল্লাসমূহ, ইস্টার্ণ হাউজিং, স্লুইসগেট, ধউর, কামারপাড়া, বিশ্ব এজতেমা ময়দানসহ ২০/২২টি ঘনবসতিপূর্ণ এলাকার বাসিন্দারা গত দেড় যুগেরও বেশি সময় ধরে ‘বালু অভিশাপের’ ধকলে জর্জরিত। শুধু তুরাগ তীরেই গদিঘর আর সাইনবোর্ড ঝুলিয়ে দুই শতাধিক মহাজন বালু বাণিজ্য ফেঁদে বসেছেন। তাদের আলাদা আলাদা গদিঘর আর পাহাড়ের মতো উচু উচু বালু সংরক্ষণাগার যেমন আছে তেমনি আছে বৃহৎ আকারের বালু উত্তোলনের মেশিনারিজ। কারো কোনো লাইসেন্স নেই, ছাড়পত্র নেই পরিবেশ অধিদপ্তরের, বালু বাণিজ্য পরিচালনার বৈধতাও নেই। কিন্তু প্রকাশ্যে শত শত শ্রমিকের বিশাল কর্মযজ্ঞ চালাচ্ছে অবৈধ এই বালু ব্যবসায়িরা। অসংখ্য ভেকু, ড্রামট্রাক, শক্তিশালী ড্রেজার, সয়েল কার্টারসহ বড় বড় মেশিনারিজ রাত দিন সচলও থাকছে সেখানে। তুরাগ তীর ধরে এসব যন্ত্রপাতির অনর্গল ঘর ঘর শব্দে আশপাশের জনজীবন অতিষ্ঠ হয়ে উঠলেও কারো টু শব্দটি করার উপায় নেই। হাজারো আবেদন নিবেদন, লিখিত অভিযোগ দাখিলসহ পরিবেশবাদীদের আন্দোলন, মানববন্ধনও বিন্দুমাত্র পাত্তা পায় না সেখানে। বরং ঘাটে ঘাটে চাহিদামাফিক মাসোহারা দিয়ে অবৈধ বালু বাণিজ্য সচল রাখা হয় বীরদর্পে। এলাকাবাসীর দাবি, দীর্ঘদিন ধরে অবৈধ বালু উত্তোলন বন্ধে কার্যকর পদক্ষেপ না থাকায় সাধারণ মানুষকে চরম মূল্য দিতে হচ্ছে। তারা দ্রুত অবৈধ বালু মহাল বন্ধ, সড়ক সংস্কার এবং ভারী যানবাহন নিয়ন্ত্রণে প্রশাসনের জরুরি হস্তক্ষেপ কামনা করেছেন। স্থানীয় সচেতন মহলের প্রশ্ন- আর কত প্রাণ ঝরলে প্রশাসনের টনক নড়বে?