
মোসা: খাদিজা খাতুন:
#ইসলামি শরিয়তের আলোকেও স্বামী-স্ত্রীর পারস্পরিক সম্পর্ক অত্যন্ত গভীর, মার্জিত এবং উন্মুক্ত। ইসলামি ফিকহ ও শরিয়তের একটি মূলনীতি হলো: স্বামী ও স্ত্রী একে অপরের জন্য সম্পূর্ণ হালাল। তারা একে অপরের পুরো শরীর দেখতে ও স্পর্শ করতে পারেন।
(১/ক)……………….#পবিত্র কুরআন থেকে দলিলঃ:
#দলিল ১:
( স্ত্রীরা স্বামীদের পোশাকস্বরূপ)
هُنَّ لِبَاسٌ لَّكُمْ وَأَنتُمْ لِبَاسٌ لَّهُنَّ
“তারা তোমাদের পরিচ্ছদ এবং তোমরা তাদের পরিচ্ছদ।”
সূরা আল-বাকারা,
আয়াত: ১৮৭,
#দলিল ২:
وَالَّذِينَ هُمْ لِفُرُوجِهِمْ حَافِظُونَ * إِلَّا عَلَىٰ أَزْوَاجِهِمْ أَوْ مَا مَلَكَتْ أَيْمَانُهُمْ فَإِنَّهُمْ غَيْرُ مَلُومِينَ
“আর যারা নিজেদের লজ্জা স্থানকে হেফাজত করে। তবে তাদের স্ত্রী অথবা মালিকানাভুক্ত দাসীদের ক্ষেত্রে ছাড়া, এতে তারা নিন্দনীয় হবে না।”
সূরা আল-মুমিনুন,
আয়াত: ৫-৬,
#দলিল ৩:
وَحِينَ تَضَعُونَ ثِيَابَكُم مِّنَ الظَّهِيرَةِ
“এবং দুপুরে যখন তোমরা তোমাদের পোশাক খুলে রাখো (তখন যেন সন্তানরা অনুমতি নিয়ে ঘরে প্রবেশ করে)।”
সূরা আন-নূর,
আয়াত: ৫৮,
#দলিল ৪:
نِسَاؤُكُمْ حَرْثٌ لَّكُمْ فَأْتُوا حَرْثَكُمْ أَنَّىٰ شِئْتُمْ
“তোমাদের স্ত্রীরা তোমাদের শস্যক্ষেত্র। অতএব, তোমরা তোমাদের শস্যক্ষেত্রে যেভাবে ইচ্ছা গমন করতে পারো।”
সূরা আল-বাকারা,
আয়াত: ২২৩,
(২/খ).……………………. #হাদিস শরিফ থেকে দলিল:
#দলিল ১:
احْفَظْ عَوْرَتَكَ إِلاَّ مِنْ زَوْجَتِكَ أَوْ مَا مَلَكَتْ يَمِينُكَ
“তুমি তোমার স্ত্রী এবং দাসী ছাড়া সবার থেকে তোমার লজ্জা স্থান হেফাজত করো (ঢেকে রাখো)।”
কিতাব:
সুনানে আবু দাউদ,
খণ্ড: ৪, পৃষ্ঠা: ৪০,
হাদিস নম্বর: ৪০১৭,
মাকতাবা:
মাকতাবাতুল আসরিয়্যাহ, বৈরুত,
#দলিল ২:
كَانَ رَسُولُ اللَّهِ صلى الله عليه وسلم يَضْطَجِعُ مَعِي فِي الشِّعَارِ الْوَاحِدِ
“রাসূলুল্লাহ (সা.) আমার সাথে একই অন্তর্বাস বা চাদরের নিচে শয়ন করতেন।”
কিতাব:
সুনানে নাসায়ী,
খণ্ড: ১, পৃষ্ঠা: ১২৭,
হাদিস নম্বর: ২৮৭
মাকতাবা:
মাকতাবুল মাতবুআতিল ইসলামিয়্যাহ, হালাব,
#দলিল ৩:
كُنْتُ أَغْتَسِلُ أَنَا وَرَسُولُ اللَّهِ صلى الله عليه وسلم مِنْ إِنَاءٍ وَاحِدٍ
“আমি এবং রাসূলুল্লাহ (সা.) একই পাত্র থেকে (একত্রে) গোসল করতাম।”
কিতাব:
সহীহ বুখারী,
খণ্ড: ১, পৃষ্ঠা: ৬০,
হাদিস নম্বর: ২৫০,
মাকতাবা:
দার তুওকিন নাজাত, বৈরুত,
#দলিল ৪:
مَا نَزَلَ عَلَيَّ الْوَحْيُ فِي لِحَافِ امْرَأَةٍ غَيْرِهَا
“আয়েশা ছাড়া অন্য কোনো স্ত্রীর লেপ বা চাদরের নিচে থাকা অবস্থায় আমার প্রতি ওহী নাযিল হয়নি।”
কিতাব:
সহীহ বুখারী,
খণ্ড: ৫, পৃষ্ঠা: ৩৬,
হাদিস নম্বর: ৩৭৭৫,
মাকতাবা:
দার তুওকিন নাজাত, বৈরুত,
(৩/গ).…………….#ইজমা/ফতোয়ার কিতাব থেকে দলিল:
#দলিল ১:
ফতোয়ায়ে হিন্দিয়া,
(হানাফি মাজহাব)
يَجُوزُ لِلرَّجُلِ أَنْ يَنْظُرَ إِلَى جَمِيعِ بَدَنِ زَوْجَتِهِ وَتَنْظُرَ إِلَى جَمِيعِ بَدَنِهِ مِنْ غَيْرِ كَرَاهَةٍ
“পুরুষের জন্য তার স্ত্রীর পুরো শরীরের দিকে তাকানো জায়েজ এবং স্ত্রীর জন্যও স্বামীর পুরো শরীরের দিকে তাকানো কোনো অপছন্দনীয়তা (করহেত) ছাড়াই জায়েজ।”
কিতাব:
আল-ফাতাওয়াল হিন্দিয়া,
(ফতোয়ায়ে আলমগীরী)
খণ্ড: ৫, পৃষ্ঠা: ৩২৭,
মাকতাবা:
দারুল ফিকর, বৈরুত,
#দলিল ২:
আল-মুগনি,
(হাম্বলি মাজহাব)
وَيَبَاحُ لِكُلِّ وَاحِدٍ مِنَ الزَّوْجَيْنِ النَّظُرُ إِلَى جَمِيعِ بَدَنِ صَاحِبِهِ وَلَمْسُهُ
“স্বামী-স্ত্রীর প্রত্যেকের জন্য অপরজনের পুরো শরীর দেখা এবং স্পর্শ করা বৈধ।”
কিতাব:
আল-মুগনি (লি ইবনে কুদামা)
খণ্ড: ৭, পৃষ্ঠা: ৭৪,
মাকতাবা:
মাকতাবাতুল কাহেরা, মিশর,
#দলিল ৩:
রওদাতুত তালিবীন,
(শাফেয়ি মাজহাব)
يَجُوزُ لِلزَّوْجِ النَّظُرُ إِلَى كُلِّ بَدَنِ الزَّوْجَةِ وَعَكْسُهُ
“স্বামীর জন্য স্ত্রীর পুরো শরীর দেখা জায়েজ এবং এর বিপরীতটাও (স্ত্রীর জন্য স্বামীর শরীর দেখা) জায়েজ।”
কিতাব:
রওদাতুত তালিবীন,
খণ্ড: ৭, পৃষ্ঠা: ২১,
মাকতাবা:
আল-মাকতাবুল ইসলামি, বৈরুত,
#দলিল ৪:
হাশিয়াতুদ দুসুকি,
(মালেকি মাজহাব)
أَنَّ الزَّوْجَيْنِ يَجُوزُ لِكُلٍّ مِنْهُمَا النَّظُرُ لِجَمِيعِ جَسَدِ صَاحِبِهِ حَتَّى الْفَرْجِ
“স্বামী-স্ত্রী প্রত্যেকের জন্য অপরজনের পুরো শরীর, এমনকি লজ্জা স্থানের দিকে তাকানোও জায়েজ।”
কিতাব:
হাশিয়াতুদ দুসুকি আলাশ শারহিল কাবির,
খণ্ড: ২, পৃষ্ঠা: ২০৫,
মাকতাবা:
দারুল ফিকর, বৈরুত,
(৪/ঘ).…………………..#কিয়াস থেকে দলিল:
#দলিল:1
নীতি ও বিশ্লেষণ:
শরিয়তে স্বামী-স্ত্রীর জন্য পরস্পরের সাথে সহবাস বা মিলন করা সম্পূর্ণ বৈধ। কিয়াসের নিয়ম অনুযায়ী, যে কাজের মূল বা সর্বোচ্চ স্তর (সহবাস) জায়েজ, তার চেয়ে নিচের স্তর (যেমন: পোশাকহীন অবস্থায় থাকা, শরীর দেখা বা স্পর্শ করা) স্বাভাবিভাবেই জায়েজ হবে।
কিতাব:
আল-বাহরুর রায়েক,
খণ্ড: ৮, পৃষ্ঠা: ২১৯,
মাকতাবা:
দারুল কিতাব আল-ইসলামি,
#দলিল ২:
নীতি ও বিশ্লেষণ:
ইসলামি উসুলের একটি বড় নিয়ম হলো, দুনিয়াবি যেকোনো আচরণ বা পারস্পরিক সম্পর্কের ক্ষেত্রে যতক্ষণ না আল্লাহ বা রাসূল (সা.) কোনো বিষয়কে স্পষ্ট ‘হারাম’ বা নিষিদ্ধ ঘোষণা করছেন, ততক্ষণ তা ‘মুবা’ বা বৈধ বলে গণ্য হবে। স্বামী-স্ত্রী একসাথে উলঙ্গ হয়ে ঘুমানো নিষিদ্ধ—এমন কোনো স্পষ্ট ও সহীহ নিষেধাজ্ঞা শরিয়তে নেই, তাই এটি বৈধ।
আল-আশবাহ ওয়ান নাজাইর,
(ইবনে নুজাইম), পৃষ্ঠা: ৬০,
মাকতাবা:
দারুল কুতুবিল ইলমিয়্যাহ, বৈরুত,
#দলিল ৩:
নীতি ও বিশ্লেষণ:
সহীহ হাদিস দ্বারা প্রমাণিত যে, স্বামী-স্ত্রী একই পাত্রের পানি দিয়ে একসাথে বিবস্ত্র হয়ে গোসল করতে পারেন। উসুলি কিয়াস অনুযায়ী, যদি গোসলের মতো অবস্থায় যেখানে পানি ব্যবহারের কারণে শরীর উন্মুক্ত থাকে, সেখানে একসাথে হওয়া জায়েজ হয়, তবে শোয়া বা ঘুমানোর ক্ষেত্রেও তা সমভাবে জায়েজ হবে।
কিতাব:
ফাতহুল বারী,
(ইবনে হাজার আসকালানি),
খণ্ড: ১, পৃষ্ঠা: ৩৬৪,
মাকতাবা:
দারুল মা’রিফাহ, বৈরুত,
#পরামর্শ ও আদব (تنبيه وأدب):
#যদিও এটি সম্পূর্ণ জায়েজ, তবে ইসলামি ফিকহের কিতাবসমূহে (যেমন: ইবনে মাজাহ-এর হাদিস ও ফতোয়ায়ে শামি) উল্লেখ করা হয়েছে যে, একদম উন্মুক্ত বা চাদর ছাড়া না ঘুমিয়ে, নিজেদের ওপর একটি চাদর বা লেপ টেনে নেওয়া উত্তম। এতে করে ফেরেশতাদের সামনে পূর্ণ উলঙ্গ হওয়া এড়ানো যায় এবং এটি বৈবাহিক সম্পর্কের একটি সুন্দর আদব।
#অতএব, স্বামী-স্ত্রী একসাথে একেই বিছানায় বা চাদরের নিচে সম্পূর্ণ বিবস্ত্র বা উলঙ্গ অবস্থায় ঘুমাতে পারবেন, এতে কোন গুনা নেই। তবে উত্তম ও আদব হলো, কোন কাপড় বা চাদর দিয়ে শরীর ঢেকে রাখা যেন একদম উন্মুক্ত না থাকে।
(#ইসলামের স্বার্থে পোস্টটি শেয়ার দিতে পারেন)
@
লেখক ও গবেষক,
মোসা: খাদিজা খাতুন,