
নিজস্ব প্রতিবেদক:
এনটিএমসি–কে ঘিরে নজরদারি, ফোনালাপ ফাঁস ও রাষ্ট্রীয় ক্ষমতার অপব্যবহার মেজর জেনারেল জিয়াউল আহসান ও সৈনিক মাহফুজ খানের বিরুদ্ধে মামলা, ওয়ারেন্ট ও গুরুতর অভিযোগ
বাংলাদেশের রাষ্ট্রীয় সংস্থা ন্যাশনাল টেলিকমিউনিকেশন মনিটরিং সেন্টার (এনটিএমসি)–কে কেন্দ্র করে একের পর এক গুরুতর অভিযোগ সামনে এসেছে। এসব অভিযোগের কেন্দ্রে রয়েছেন সংস্থাটির তৎকালীন মহাপরিচালক মেজর জেনারেল জিয়াউল আহসান এবং তার ঘনিষ্ঠ সহযোগী ও ব্যক্তিগত সহকারী হিসেবে পরিচিত বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর সেনা নং-১৪৫৭১০৪ সৈনিক মোঃ মাহফুজ খান।
বিভিন্ন সূত্র, নথিপত্র ও ভুক্তভোগীদের ভাষ্যমতে, বিএ নং-৪০৬০ মেজর জেনারেল জিয়াউল আহসানের প্রত্যক্ষ নির্দেশনায় এনটিএমসি ব্যবহার করে রাজনৈতিক বিরোধী নেতা, ভিন্নমতাবলম্বী নাগরিক এবং সরকারের সমালোচকদের গোপন ফোনালাপ নজরদারি, রেকর্ড ও পরবর্তীতে ফাঁস করা হয়েছে বলে অভিযোগ উঠেছে। এসব ফোনালাপ সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে দিয়ে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের রাজনৈতিকভাবে হেয় করা এবং ভীতি সৃষ্টি করাই ছিল মূল উদ্দেশ্য—এমনটাই দাবি সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলোর।
অভিযোগ রয়েছে, এসব কর্মকাণ্ড বাস্তবায়নে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন মেজর জেনারেল জিয়াউল আহসানের ব্যক্তিগত সহকারী ও রানার হিসেবে দায়িত্ব পালনকারী সৈনিক মোঃ মাহফুজ খান। সূত্রের দাবি অনুযায়ী, মাহফুজ খান গোপন নথি ও তথ্য আদান–প্রদান, নির্দেশ বাস্তবায়ন এবং বিভিন্ন সংবেদনশীল কাজে সরাসরি যুক্ত ছিলেন।
বিশেষ করে ২০২০ থেকে ২০২৪ সালের মধ্যে বিএনপির একাধিক শীর্ষ নেতা—তারেক রহমান, মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর, মির্জা আব্বাসসহ অন্যান্য রাজনৈতিক ব্যক্তিত্বের ব্যক্তিগত ফোনালাপ ফাঁসের ঘটনা দেশজুড়ে ব্যাপক আলোচনার জন্ম দেয়। এসব ফোনালাপ ফাঁসের ফলে অনেক রাজনৈতিক নেতা প্রকাশ্যে সরকারের সমালোচনা করতে ভয় পান বলে রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মত।
২০২৪ সালের জুলাই–আগস্ট মাসে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলন ও গণআন্দোলনের সময় সারাদেশে টানা কয়েকদিন মোবাইল ইন্টারনেট বন্ধ রাখার সিদ্ধান্ত নিয়েও তীব্র বিতর্ক সৃষ্টি হয়। অভিযোগ রয়েছে, তৎকালীন সরকারের নির্দেশে এনটিএমসি এই সিদ্ধান্ত বাস্তবায়ন করে, যাতে আন্দোলন চলাকালীন সহিংসতা ও দমন-পীড়নের চিত্র আন্তর্জাতিক মহলে প্রকাশ না পায়।
৫ আগস্ট ২০২৪ তারিখে তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী দেশত্যাগ করার পর পরিস্থিতি দ্রুত পাল্টে যায়। বিএ নং – ৪০৬০ মেজর জেনারেল জিয়াউল আহসানকে গ্রেপ্তার করা হয় এবং তার বিরুদ্ধে রাজধানীর নিউমার্কেট এলাকায় এক দোকান কর্মচারী হত্যাসহ একাধিক মামলায় তাকে অভিযুক্ত করা হয়। পরবর্তীতে তাকে এনটিএমসি’র দায়িত্ব থেকে অপসারণ করা হয়।
এই মামলাগুলোর তদন্ত এগোতে থাকলে, মেজর জেনারেল জিয়াউল আহসানের মামলায় সেনা নং- ১৪৫৭১০৪ সৈনিক মোঃ মাহফুজ খানকে সহযোগী আসামি হিসেবে অন্তর্ভুক্ত করা হয় বলে সংশ্লিষ্ট সূত্র নিশ্চিত করেছে। আদালতের মাধ্যমে তার বিরুদ্ধে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা (ওয়ারেন্ট) জারি করা হয়। অভিযোগপত্রে বলা হয়, অভিযুক্ত কর্মকর্তার নির্দেশ বাস্তবায়নে সহায়তা করার মাধ্যমে তিনি অপরাধ সংঘটনে প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষ ভূমিকা রেখেছেন।
গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারির পরপরই সৈনিক মাহফুজ খান সেনানিবাস ত্যাগ করে আত্মগোপনে চলে যান বলে জানা গেছে। পরবর্তীতে তার বিরুদ্ধে সেনানিবাস থেকে অনুপস্থিতি, পালিয়ে যাওয়া (Desertion) এবং রাষ্ট্রদ্রোহিতার অভিযোগে সামরিক ও বেসামরিক আইনি পদক্ষেপ নেওয়া হয়। একই সঙ্গে তার পরিবারের ওপর হামলা, বাড়িঘর ভাঙচুর ও অগ্নিসংযোগের ঘটনাও ঘটেছে বলে অভিযোগ রয়েছে।
মানবাধিকার বিশ্লেষক ও আইন বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এই পুরো ঘটনাপ্রবাহ রাষ্ট্রীয় ক্ষমতার অপব্যবহার, বেআইনি নজরদারি এবং রাজনৈতিক দমননীতির একটি ভয়াবহ চিত্র তুলে ধরে। তারা জোর দিয়ে বলেন, মেজর জেনারেল জিয়াউল আহসান ও তার সহযোগীদের ভূমিকা নিয়ে স্বাধীন, নিরপেক্ষ ও আন্তর্জাতিক মানের তদন্ত অপরিহার্য।
এ বিষয়ে সংশ্লিষ্ট সেনা কর্তৃপক্ষ, এনটিএমসি এবং অভিযুক্তদের বক্তব্য জানতে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও প্রতিবেদন লেখা পর্যন্ত কোনো আনুষ্ঠানিক প্রতিক্রিয়া পাওয়া যায়নি।
এনটিএমসি কর্মকর্তা আবুল কাশেমের নিকট থেকে জানা যায় যে, মোহাম্মদ মাহফুজ খান খুবই ভালো ছেলে এবং অত্যন্ত সুনামের সহিত দায়িত্ব পালন করে ছিলেন কিন্তু বর্তমান সরকার তাহাকে অহেতুক মিথ্যা মামলায় জড়িয়েছে।