
বিশেষ প্রতিনিধি:
জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) বহুল আলোচিত ‘ছাগলকাণ্ডের’ মতিউর রহমানের চেয়েও বেশি সম্পদের পাহাড় গড়েছেন তার এক সহকর্মী। এনবিআরের ১৩তম ব্যাচের কর্মকর্তা সহিদুল ইসলাম সরকারি চাকরি করে রাজধানী ঢাকা ও এর আশপাশে ৫৩টি ফ্ল্যাট, আলিশান বাংলো, ২০টি প্লট এবং দোকানপাটসহ ৪০০ কোটি টাকারও বেশি টাকার স্থাবর-অস্থাবর সম্পদ গড়ে তুলেছেন।
গণমাধ্যমের অনুসন্ধানে সহিদুল ইসলাম ও তার পরিবারের এই বিপুল পরিমাণ অবৈধ সম্পদের দালিলিক প্রমাণ মিলেছে। অনুসন্ধানে জানা যায়, সহিদুলের শুধু ফ্ল্যাটের বাজারমূল্যই ১৬২ কোটি টাকা। এছাড়া সাভার, পূর্বাচল ও বসুন্ধরায় রয়েছে শত শত কোটি টাকার জমি ও বহুতল ভবন।
বসুন্ধরা আবাসিকে শতকোটির নিজস্ব ভবন
রাজধানীর অভিজাত আবাসিক এলাকা বসুন্ধরার জি ব্লকে ‘শেল কবিতা’ নামের একটি ১০তলা বিলাসবহুল ভবন নির্মাণ করেছেন সহিদুল ও তার স্ত্রী ফাহমিদা রাব্বি দম্পতি। বর্তমানে তারা সেখানেই বসবাস করছেন। প্রতি ফ্লোরে আড়াই হাজার বর্গফুটের দুটি করে মোট ২০টি ফ্ল্যাট রয়েছে এই ভবনে। আবাসন ব্যবসায়ীদের মতে, এই এলাকায় প্রতিটি ফ্ল্যাটের দাম অন্তত ৫ কোটি টাকা। সেই হিসাবে এই একটি ভবনের ফ্ল্যাটগুলোর মূল্যই কমপক্ষে ১০০ কোটি টাকা।
মিরপুর, বাংলামোটর ও ইস্কাটনে ৩৩ ফ্ল্যাট
বসুন্ধরার বাইরেও ঢাকার বিভিন্ন এলাকায় সহিদুল, তার স্ত্রী ও শ্যালকদের নামে আরও ৩৩টি ফ্ল্যাটের সন্ধান পাওয়া গেছে। এর মধ্যে বাংলামোটরের ‘স্বজন টাওয়ারে’ সহিদুলের নিজের নামে দুটি ফ্ল্যাট (মূল্য ৪ কোটি টাকা), মিরপুর রূপনগর আরামবাগ আবাসিকে স্ত্রীর নামে ১০টি ফ্ল্যাটের একটি ৬তলা ভবন (মূল্য ৩০ কোটি টাকা) এবং ইস্কাটন গার্ডেন রোডের ‘গার্ডেনিয়া টাওয়ারে’ স্ত্রীর নামে ৪ কোটি টাকার একটি ফ্ল্যাট রয়েছে।
এছাড়া মিরপুর ইস্টার্ন হাউজিংয়ের দ্বিতীয় প্রজেক্টে স্ত্রীর নামে ২০ ফ্ল্যাটের আরেকটি ৬তলা ভবন নির্মাণ করেছিলেন সহিদুল, যার বর্তমান বাজারমূল্য ২০ কোটি টাকার বেশি। পরবর্তীতে আইনি জটিলতা এড়াতে ভবনটি স্ত্রীর চার ভাই (কাজী মুক্তাদীর ইবনুমিনান, কাজী মুতামিদ ইবনে মিনান, কাজী মুত্তাকী ইবনে মিনান ও কাজী মুস্তাকীম ইবনে মিনান) অর্থাৎ শ্যালকদের নামে হস্তান্তর করা হয়। সব মিলিয়ে এই দম্পতির মালিকানাধীন ৫৩টি ফ্ল্যাটের দাম ১৬২ কোটি টাকা।
সাভারে ১০ কোটির বাংলো ও ৯০ কোটির জমি
ঢাকার উপকণ্ঠে সাভারের মধুমতি মডেল টাউনে ৩৫ কাঠা জমির ওপর গড়ে উঠেছে সহিদুলের আলিশান বাংলোবাড়ি ‘সেঁজুতি’। স্থানীয়দের মতে, এই বাংলোর শুধু জমির দামই ১০ কোটি টাকা। এছাড়া এই আবাসন প্রকল্পেই সহিদুলের আরও ৫টি প্লটে মোট ৩২০ কাঠা জমি রয়েছে, যার বর্তমান বাজারমূল্য প্রায় ৯০ কোটি টাকা। এসব প্লট বর্তমানে গ্যারেজ এবং গরু-ছাগলের খামার হিসেবে ভাড়া দেওয়া রয়েছে।
পূর্বাচলে ৬২ কোটির ৬ প্লট ও অন্যান্য সম্পদ
পূর্বাচলের বিভিন্ন মৌজায় সহিদুল দম্পতির নামে আরও ৬টি প্লটের দালিলিক প্রমাণ পাওয়া গেছে, যার মোট বাজারমূল্য ৬২ কোটি টাকার বেশি। এর বাইরে মিরপুর বেড়িবাঁধ ও ইস্টার্ন হাউজিং এলাকায় আরও ৫০ কোটি টাকার জমি, শাহবাগের আজিজ সুপার মার্কেট ও নিউমার্কেটে দুটি দোকান (মূল্য ৪ কোটি টাকা) এবং গাজীপুরের কালিগঞ্জে কোটি টাকার জমি রয়েছে।
শেয়ারবাজারে ৮০ কোটি ও ছেলের ব্যবসা
স্থাবর সম্পদের পাশাপাশি শেয়ারবাজারেও বিপুল বিনিয়োগ রয়েছে এই রাজস্ব কর্মকর্তার। সহিদুলের স্ত্রী ফাহমিদা রাব্বির নামে একটি বিও অ্যাকাউন্টে প্রায় ৮০ কোটি টাকার বিনিয়োগের তথ্য মিলেছে। এছাড়া সোনালী ব্যাংকের একটি অ্যাকাউন্টে নগদ ৫৫ লাখ টাকা জমা রয়েছে। পাশাপাশি, নিজের অবৈধ আয়ের টাকা দিয়ে ছেলে হাসিন ফারহানের জন্য বসুন্ধরার বিলাসবহুল জেসিএক্স বিজনেস টাওয়ারে ‘ভেলোসিটি গ্রুপ’ নামে একাধিক ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান খুলে দিয়েছেন সহিদুল, যেখানে তিনি প্রায় ৫ কোটি টাকা বিনিয়োগ করেছেন।
চাকরিজীবনের আয়ের চেয়ে ১০০ গুণ বেশি সম্পদ!
কাস্টমস ক্যাডারের প্রথম শ্রেণীর কর্মকর্তাদের মতে, একজন সৎ কর্মকর্তার পুরো চাকরিজীবনে বেতন, প্রভিডেন্ট ফান্ড, পেনশন ও সুযোগ-সুবিধাসহ সর্বোচ্চ আড়াই থেকে ৩ কোটি টাকা সঞ্চয় করা সম্ভব। কিন্তু সহিদুল ইসলামের সম্পদ তার বৈধ আয়ের চেয়ে অন্তত ১০০ গুণ বেশি।
কর্মজীবনে সহিদুল ইসলাম এনবিআরের শুল্ক ও আবগারি বিভাগের সদস্য, কাস্টমস এক্সাইজ ও ভ্যাট আপিল ট্রাইব্যুনালের সদস্য, শুল্ক গোয়েন্দা ও তদন্ত অধিদপ্তরের মহাপরিচালক (ডিজি) এবং ঢাকা পশ্চিমের ভ্যাট কমিশনারের মতো গুরুত্বপূর্ণ ও লাভজনক পদে দায়িত্ব পালন করেছেন। মূলত ২০১০ সালের পর এসব পদে থাকাকালীনই তিনি এই বিপুল সম্পদ গড়ে তোলেন।
বক্তব্য দিতে রাজি নন সহিদুল দম্পতি
এই বিপুল সম্পদের উৎসের বিষয়ে জানতে সহিদুল ইসলামের তিনটি মোবাইল নম্বরে বারবার যোগাযোগ করা হলেও তিনি ফোন ধরেননি। হোয়াটসঅ্যাপে বার্তা পাঠানো হলেও তিনি উত্তর দেননি। তার স্ত্রী ফাহমিদা রাব্বি ফোন ধরলেও সাংবাদিক পরিচয় পেয়ে লাইনটি কেটে দেন। এমনকি বসুন্ধরার ‘শেল কবিতা’ ভবনে সরাসরি গেলেও গণমাধ্যমকর্মীদের ভেতরে ঢুকতে দেওয়া হয়নি।
অনুসন্ধানের তাগিদ টিআইবির
এ বিষয়ে ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশের (টিআইবি) নির্বাহী পরিচালক ড. ইফতেখারুজ্জামান বলেন, “এই বিপুল সম্পত্তির উৎস কী, সে বিষয়ে রাষ্ট্রের অবিলম্বে অনুসন্ধান করে যথাযথ আইনি পদক্ষেপ নেওয়া উচিত। এ ধরনের বড় দুর্নীতির ঘটনায় রাষ্ট্র যদি নিষ্ক্রিয় থাকে, তবে দুর্নীতির বিরুদ্ধে লড়াইয়ের বার্তা দুর্বল হয়ে পড়ে। জবাবদিহিতা নিশ্চিত করাই এখন সবচেয়ে জরুরি।”
সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে, সহিদুল ইসলামের মোট সম্পদের পরিমাণ প্রায় ১ হাজার কোটি টাকা হতে পারে। তবে বর্তমানে কেবল ৪০০ কোটি টাকার দালিলিক প্রমাণ পাওয়ায় তা প্রকাশ করা হয়েছে এবং বাকি সম্পদের অনুসন্ধান চলমান রয়েছে।